গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি.
বয়সের ভারে নূয়ে পড়েছে অসহায় ভূমিহীন বাদলী বেওয়া (৮৫)। জীবন যুদ্ধে
বেঁচে থাকাই কঠিন তার। প্রায় ৫০ বছর আগে মারা গেছে স্বামী মসলেম
উদ্দিন। গরীব স্বামী ঠিকমত ভাত কাপড় দিতে পারেনি। তবু ওই স্বামীই ছিল
তার একমাত্র অবলম্বন । স্বামীর অবর্তমানে মেয়ে সাজেদা ও ছেলে আলালকে
মানুষ করার জন্য হাট বাজারে ও স্কুলের সামনে আইসক্রিম, বাদাম,
তিলেখাজা, মদনকটকটি ইত্যাদি বিক্রি করে কোনমতে জীবন চালিয়েছে
সে। মেয়েকে বড় করে বিয়ে দিলে ১ ছেলে রেখে সে মারা যায়। ছেলে আলাল বড়
হয়ে বিয়ে করে থাকে নন্দীগ্রামে । খরচ তো দূরের কথা মনের ভুলে মাকে
দেখতেও আসে না হতভাগা ছেলে।
এখন লাঠিতে ভর করে হাঁটতে হয় বাদলী বেওয়াকে। বয়স্ক ভাতা ছাড়া আর
কোনো সাহায্য সহযোগীতা পায়নি বাদলী। এখন পরের বাড়ী ভিক্ষা করে
জীবন চলে তার। বাদলী জানায়, আমি চাঁচকৈড় কাচারীপাড়া মহল্লার মৃত-
বশরত মোল্লার মেয়ে। বাপের কুলে সবাই মারা গেছে। আপন বলতে শুধু আমিই
আমার। বাদলী আরো জানায়, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড়
বাজারের হাজি আজিজুল হকের পাটের গুদামের অস্থায়ী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে
ছয়মাস ধরে ভাত রান্না করে খাইয়েছি মুক্তিযোদ্ধাদের।
মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড. তোফাজ্জল হোসেন, আনোয়ার মাষ্টার, হাকিম সরকার,
লতিফ মৃধা, ইসমাইল মাষ্টার, দুদু, হামিদ, আসাদ সরকারসহ অনেকেই আমার
হাতের রান্না খেয়েছে। বিনিময়ে ওরা শুধু খেতে দিতো। এখন দেশ বদলাইছে-
সবাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কারও চোখেই পড়েনা বাদলীকে। পৌরসভার
মেয়ররাও দেখতে পায়না। অথচ তারাও বাদলীর রান্না খেয়েছে। বাদলীর
মনে অনেক দুঃখ-ক্ষোভ। তার জীবনে কোনদিন সে ভালো খাবার খেতে পায়নি।
সুখের স্বপ্ন দেখাই ছিল তার দুঃস্বপ্ন। কতজন যুদ্ধ না করেও মুক্তিযোদ্ধা
হয়েছে। অথচ মুক্তিযোদ্ধাদের বাবুর্চি হয়েও সে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি
পায়নি। মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট এনে দেয়ার কথা বলে সহজ সরল বাদলীর
কাছ থেকে কতজন টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রতারনা করেছে। বাদলী
সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে আফসোস করে বলেন, কোনো সাংবাদিকই তার
কষ্টের ইতিহাস তুলে ধরেনি জাতির সম্মুখে। তার শেষ ইচ্ছে যদি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কিছু ভালো খাবার খেতে পারতো আর
মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেত, তাতেই তার জীবন ধন্য হতো বলে সে
আবেগতাড়িত হয়ে যায়। চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়ে। শরীর বেকে গেছে।
এভাবেই একদিন বাদলীর চলে যাওয়া হবে না ফেরার দেশে। তারপর মনে হবে বাদলী
নামের কেউ ছিলনা আমাদের জীবনে।