কামরুজ্জামান শাহীন,ভোলা:
চলতি মৌসুমের শুরুতে আগাম বৃষ্টি এবং সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে সারা
দেশের মত ভোলায়ও ব্যাপক রবি শস্যের ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। এতে করে ছোট-
বড় মিলিয়ে প্রায় ৪৫ হাজার ৮শ’ ৪০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
যার ফলে এ বছর ভোলায় ৮৬ হাজার ৩শ’ ৩০ হেক্টর জমির মধ্যে ১৯ হাজার ১৬
হেক্টর জমি দূর্যোগ কবলিত হয়। যার মধ্যে ৬ হাজার ৮শ’ হেক্টর জমি
সম্পূর্ণ এবং ১৬ হাজার ৪শ’ ১৬ হেক্টর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিলো তাতেও প্রতিবন্ধকতা
সৃষ্টি হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে কি না তা নিয়ে সংশয়
দেখা দিয়েছে। যার ফলে ১ লাখ ৫৭ হাজার ১৬ মেট্রিক টন ফসলের ক্ষতির
সম্ভাবনা রয়েছে। যার অর্থেক পরিমান হচ্ছে ১৯৪ কোটি ১৩ লাখ ৯০
হাজার টাকা। জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে দূচিন্তায় পড়েছেন ভোলার
কৃষকরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের
৭মার্চ থেকে ১১মার্চ পর্যন্ত আগাম বৃষ্টি এবং লঘুচাপের কারণে এ
বছর ভোলায় ৪ হাজার ১শ’ ৫০ জন কৃষকের গোলা আলুর ৮ হাজার ৬শ’ ৯০
হেক্টর জমির মধ্যে ১ হাজার ৯শ’ হেক্টর জমি দূর্যোগ কবলিত হয়ে
আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত জমির মধ্যে সম্পূর্ণ
ক্ষতিতে রূপান্তর হয় ৭শ’ ৬০ হেক্টর। যার উৎপাদন অনুসারে সম্ভাব্য ক্ষতির
পরিমান ২১ হাজার ২শ’ ৮০ মেট্রিকটন। যার অর্থ হচ্ছে ২১ কোটি ২৮
লাখ টাকা।
তরমুজে ৬ হাজার ৫০ জন কৃষকের ১২ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমির মধ্যে ৪
হাজার ৩শ’ ৯০ হেক্টর জমি দূর্যোগ কবলিত হয়ে ২ হাজার ৮শ’ ৯৫ হেক্টর
সম্পূর্ণ ও ২ হাজার ৯শ’ ৯০ হেক্টর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎপাদন
অনুসারে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমান ১ লাখ ৩০ হাজার ২শ’ ৭৫ মেট্রিক টন।
যার অর্থ হচ্ছে ১৩০ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
তিল-এ ২শ’ ১০ জন কৃষকের ৩শ’ ২০ হেক্টর জমির মধ্যে ৬৬ হেক্টর
দূর্যোগ কবলিত হয়। এরমধ্যে ৩৩ হেক্টর জমি সম্পূর্ণ এবং ৬৬ হেক্টর
আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎপাদন অনুসারে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমান ৩৩
মেট্রিক টন। যার অর্থের পরিমান হচ্ছে ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
খেসারীতে ২ হাজার ৭শ’ কৃষকের ১৬ হাজার ৬শ’ ৬০ হেক্টর জমির মধ্যে ১
হাজার ৭শ’ হেক্টর দূর্যোগ কবলিত হয়। এরমধ্যে ৮৫ হেক্টর জমি সম্পূর্ণ
এবং ১ হাজার ৭শ’ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎপাদন অনুসারে সম্ভাব্য
ক্ষতির পরিমান ১শ’ ২ মেট্রিকটন। যার অর্থের পরিমাণ হচ্ছে ৪ লাখ ৮০
হাজার টাকা।
মুগ-এ ১৫ হাজার ৭শ’ ৫০ জন কৃষকের ২৪ হাজার ৬শ’ ৮০ হেক্টর জমির
মধ্যে ৮ হাজার ২শ’ ৫০ হেক্টর জমি দূর্যোগ কবলিত হয়ে ১ হাজার ৬শ’
৫০ হেক্টর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎপাদন অনুসারে সম্ভাব্য ক্ষতির
পরিমান ১ হাজার ৯শ’ ৮০ মেট্রিকটন। যার অর্থের পরিমান হচ্ছে ১৯
কোটি ৮০ লাখ টাকা।
মরিচ-এ ১৪ হাজার ১শ’ কৃষকের ১৬ হাজার ৯শ’ ৮০ হেক্টর জমির মধ্যে ১
হাজার ৫শ’ ৪০ হেক্টর জমি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎপাদন অনুসারে
সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমান ১ হাজার ৯শ’ ২০ মেট্রিকটন। যার অর্থের
পরিমান ১৯ কোটি ২০ লাখ টাকা।
শাক-সবজিতে ২ হাজার ৪শ’ ৮০ জন কৃষকের ৬ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমির
মধ্যে ৭শ’ ৭০ হেক্টর দূর্যোগ কবলিত হয়ে ৭৭ হেক্টর জমি সম্পূর্ণ
ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎপাদন অনুসারে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমান ১ হাজার ৩শ’
৮৬ মেট্রিকটন। যার অর্থের পরিমান ২ কোটি ৭৭ লাখ ২০ হাজার টাকা।
সয়াবিন-এ ৪শ’ কৃষকের ৬ হাজার ৬শ’ হেক্টর জমির মধ্যে ৫শ’ হেক্টর
দূর্যোগ কবলিত হয়ে ২০ হেক্টর জমি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎপাদন
অনুসারে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমান ৪০ মেট্রিকটন। যার অর্থের পরিমান ১৪
লাখ টাকা।
আগাম বৃষ্টি ও সৃষ্ট লঘুচাপের রবি শস্য হারিয়ে কৃষকরা এখন
দিশেহারা। ইলিশা ইউনিয়নের আলু চাষি নুরে আলম জানান, এ বছর
তিনি ১০ একর জমিতে আলু চাষ করেছেন। এর মধ্যে ভাইরাসে ৫ একর
জমির আলু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩ একর জমির আলু বিক্রি করলেও বাকী ২
একরের আলু উত্তেলন করা সম্ভব হয়নি। তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে ১ একর
আলু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যা টাকার অংকে প্রায় ২ লাখ টাকা। চর আনন্দ
গ্রামের চাষি সিরাজ ও রহিম বলেন, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আলু
আবাদ করেছি, কিছু জমির আলু বাজারে বিক্রি করলেও বৃষ্টিতে খেতের
অনেক আলু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত তরমুজ চাষীরা বলছেন, গত বছর তরমুজের বাম্পার ফলন হওয়ায় এ
বছর আরো বেশি জমিতে তরমুজের আবাদ করা হয়েছে। কিন্তু ফলন তোলার
আগেই শীলাবৃষ্টিতে তরমুজ খেতে বিপর্যয় নেমে এসেছে। অনেকেই
এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চরম সংকটের মধ্যে পড়েছেন। কেউ কেউ খেত
পরিচর্যা করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, তবে বেশিরভাগ চাষিই
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কীভাবে আবাদের খরচ উঠাবেন আর ঋণ পরিশোধ
করবেন তা নিয়ে চিন্তিত কৃষকরা।
এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক প্রশান্ত
কুমার সাহা’র সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ভোলায় এ
বছর রবি শস্যের যে পরিমান ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে তার একটি তালিকা করা
হয়েছে। ওই তালিকা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠিয়ে ক্ষতিপূরণ
চাওয়া হয়েছে। সেখান থেকে ক্ষতিপূরণ পেলে তা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের
মাঝে বিতরণ করা হবে। এছাড়া যে সমস্ত কৃষকদের রবি শস্য আংশিক
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদেরকে সৃষ্ট সমস্যা থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য
বিভিন্নভাবে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন তারা।