এম শিমুল খান, গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জের মধুমতি
নদীটা বেশ শান্ত। কোমল জলে উত্তাল তরঙ্গ নেই। পাড় ভাঙার
বিধ্বংশী আচরণ নেই। কেবল আপন মনে বয়ে চলছে জোয়ার
ভাটার নিয়ম মেনে। মধুমতির জলের উপর ভেসে বেড়ায় ছোট
বড় নৌকা, ট্রলার আর নদীর যতো যান। এখানে সেখানে জাল
পেতে ধরা হয় নানা প্রজাতির মাছ। নদীটার জন্য তাই তীরে
গড়ে ওঠা জনপদের ভালোবাসাও রয়েছে অনেক।
গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বাঁশবাড়িয়া
গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মধুমতি। বয়ে গেছে আরও
অনেক জনপদ ঘেঁষে। কিন্তু বাঁশবাড়িয়ার মধুমতি নদীটা
একটু অন্য রকম। এখানে দাঁড়িয়ে চোখ মেললে সামনে
ভেসে ওঠে বাংলাদেশের তিন বিভাগের তিনটি জেলা। এক
মধুমতি এখানে তিন বিভাগ আর তিন জেলাকে মিলন
মেলায় রুপান্তর করেছে। তৈরী করে দিয়েছে তিন বিভাগের
তিনটি জেলার মানুষ গুলির মধ্যে সেতু বন্ধন। নদীটা না
থাকলে হয়তো ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ জেলা, বরিশাল
বিভাগের পিরোজপুর জেলা ও খুলনা বিভাগের বাগেরহাট
জেলা তিনটি এক সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতো।
ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া উপজেলার
বাঁশবাড়িয়া হয়ে মধুমতি নদী পেরিয়ে বরিশাল বিভাগের
পিরোজপুরে যেতে সময় গুনতে হবে বড় জোর দুই মিনিট।
নদীটা পেরুনোর জন্য বাঁশবাড়িয়া ব্রিজ নামে ছোট
একটা সেতু রয়েছে এখানে। আর খুলনার বাগেরহাট যেতে
হলে চড়তে হবে নৌকায়। পাঁচ মিনিটের মাথায় ওপারে
বাগেরহাটে পৌঁছান যাবে। স্থানীয় ভাবে একটি কথা
প্রচলিত আছে যে একটি সিগারেট ধরিয়ে শেষ হওয়ার
আগেই তিন বিভাগের তিন জেলা ঘুরে আসা যায়।
বাঁশবাড়িয়ায় দাঁড়িয়ে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার
বাটনাতলাই চোখে পড়বে সবার আগে। আর এখান থেকে
বাগেরহাটে যেতে হলে চিতলমারী উপজেলার শৈলদাহ
গ্রামেই আগে পা পড়বে। মধুমতির তীর ঘেঁষে থাকা এ
তিন জেলার মানুষগুলোর মধ্যেও রয়েছে দারুন মিল। ভিন্ন
তিনটি বিভাগ, ভিন্ন তিনটি জেলা হলেও আত্মীয়তা,
আসা-যাওয়া আর পারস্পরিক সম্পর্ক পাশাপাশি তিনটি
গ্রামের মানুষের মতোই।
মধুমতির একেবারে তীরে রবিউল মিয়ার ভাই ভাই হোটেল।
তিনি বলেন, এখান থেকে ওপারে বাগেরহাটের শৈলদাহে
যেতে খেয়া ভাড়া লাগে ১০ টাকা। পাঁচ থেকে সাত
মিনিটের মধ্যেই চলে যাওয়া যায়।
মতিন ফকির নামে এক বৃদ্ধ বলেন, ৫০/৬০ বছর আগে
নদীটা আরও বড় ছিল। চর জেগে এখন আরও কাছে হয়ে
গেছে। অনেক আগে নদীটা অল্প অল্প ভাঙতো। এখন আর ভাঙে
না।
স্থানীয়রা জানায়, এ নদীতে শিং, কৈ, চিংড়ী, আইড়সহ
নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। জেলেরা নিয়মিত জাল
ফেলে এ নদীতে। এখানে নদীর গভীরতাও খুব একটা বেশি না।
গভীরতা না থাকায় মাছ ধরাটাও সহজ। এক বিড়িতেই ঘুরে
আসা যায় তিন জেলা। জেলা ভিন্ন ভিন্ন হলেও বাগেরহাট,
পিরোজপুর আর গোপালগঞ্জের মধুমতি ঘেঁষা মানুষগুলোর
প্রাণ যেনো একই। পারস্পরিক যোগাযোগও তাই তাদের
মাঝে প্রবল।
স্থানীয় ব্যবসায়ী শ্যামল কান্তি সে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে
দিয়ে বললেন, তিন বিভাগের এ তিন জেলার মাঝে মধুমতি
মধুর মিলন সৃষ্টি করে দিয়েছে।