অনলাইন ডেস্কঃ
অস্ত্রোপচার করে জমজ সন্তানের একটিকে গর্ভে রেখেই মায়ের পেট সেলাই করে দেওয়া চিকিৎসক শেখ হোসনে আরা বেগমসহ তিনজনকে তলব করেছেন হাইকোর্ট।
আগামী ৭ নভেম্বর তাঁদের হাইকোর্টে হাজির হয়ে গর্ভে একটি বাচ্চা রাখার বিষয়ে ব্যাখা দিতে বলা হয়েছে।
কুমিল্লার দাউদকান্দির গৌরীপুর লাইফ হসপিটাল অ্যান্ড ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিকিৎসক শেখ হোসনে আরা বেগম ছাড়া অপর দুইজন হলেন, কুমিল্লার সিভিল সার্জন ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক।
পত্রিকায় প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আজ রোববার হাইকোর্টের বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ স্বপ্রনোদিত হয়ে এ আদেশ দেন।
এর আগে আদালতে আজ এ বিষয়টি নজরে আনেন ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলন। তিনি জাতীয় পত্রিকার এ সংক্রান্ত খবর আদালতের নজরে আনার পর আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে এই আদেশ দেন।
মাহফুজুর রহমান মিলন সাংবাদিকদের জানান, কুমিল্লার গৌরিপুরের একটি ক্লিনিকে টিউমার ভেবে প্রসূতির পেটে সন্তান রেখেই অস্ত্রোপচার শেষ করার ঘটনায় কুমিল্লার সিভিল সার্জন, অভিযুক্ত হাসপাতাল লাইফ হসপিটাল অ্যান্ড ডিজিটাল ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের মালিক এবং হোসনে আরা বেগমকে তলব করেছেন হাইকোর্ট।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, কুমিল্লার হোমনা উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের আউয়াল হোসেনের স্ত্রী খাদিজা আক্তারকে (২২) গত ১৮ সেপ্টেম্বর দাউদকান্দির গৌরিপুর লাইফ হসপিটাল অ্যান্ড ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অস্ত্রোপচার করা হয়। সেখানে খাদিজার পেটে একটি সন্তান রেখেই অস্ত্রোপচার শেষ করার অভিযোগ ওঠে ডা. শেখ হোসনে আরার বিরুদ্ধে। গর্ভে মৃত সন্তান বহন করে খাদিজা বেগম। একমাস পর গত ২৬ অক্টোবর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগে অস্ত্রোপচার করে ওই শিশু অপসারণ করা হয়েছে।
আলট্রাসনোগ্রাফিতে যমজ সন্তানের কথা উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরিপুরের ‘লাইফ হাসপাতাল’-এর চিকিৎসক হোসনে আরা বেগম গত ১৮ সেপ্টেম্বর অস্ত্রোপচারের সময় একটি সন্তান গর্ভে রেখেই সেলাই করে দেন। অন্য সন্তানকে টিউমার বলে চালিয়েছিলেন ওই চিকিৎসক। এতে গর্ভেই মারা যায় অনাগত সন্তান। তবে অস্ত্রোপচারে বের করা কন্যাসন্তান আদিবা ইসলামের বয়স এখন এক মাস। আদিবা সুস্থ আছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক নিলুফার সুলতানা বলেন, ‘আমরা মৃত বাচ্চাটিকে জরায়ুর বাইরে পেয়েছি। সাধারণত যে সিজারিয়ানের মাধ্যমে প্রসব ঘটানো হয় তেমন অপারেশনের মাধ্যমে এ বাচ্চাটি বের করার মতো ছিল না। এটা খুবই জটিল একটি কাজ।’
বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক বলেন, ‘সব চিকিৎসকের পক্ষে নিরাপদে এমন জটিল ডেলিভারি করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ ক্ষেত্রে আলাদা দক্ষতার দরকার হয়। শুরুতেই যদি ঢাকায় নিয়ে আসা হতো তবে হয়তো বিষয়টি এমন নাও হতে পারত।’
গত ১৮ সেপ্টেম্বর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যমজ অন্য সন্তান বের করার সময় জরায়ুর বাইরে থাকা এই শিশুটি জীবিত ছিল কি না—এ প্রশ্নে ডা. নিলুফার সুলতানা বলেন, ‘এত দিন পরে তা বোঝা সম্ভব নয়।’ অস্ত্রোপচারের পর প্রসূতি খাদিজার অবস্থা এখন কিছুটা ভালো বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তবে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জানা যায়, গৌরিপুরের ‘লাইফ হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারটির’ কোনো সরকারি অনুমোদন ছিল না। এক বছর ধরে অনুমোদন ছাড়াই এটি চালানো হচ্ছিল। এক শ্রেণির চিকিৎসক খণ্ডকালীন ওই হাসপাতালে কাজ করতেন।
খাদিজা কুমিল্লার হোমনা উপজেলার দুলালাপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের ওমানপ্রবাসী আবদুল আউয়ালের স্ত্রী। তাঁর মা আমেনা বেগম জানান, গত ১৮ সেপ্টেম্বর দাউদকান্দির ওই হাসপাতালে হোসনেয়ারা ও মঞ্জুরুল ইসলাম অন্তঃসত্ত্বা খাদিজার অস্ত্রোপচার করেন। তখন একটি কন্যাসন্তান প্রসব করেন খাদিজা।
হোসনে আরা ওই সময় জানিয়েছিলেন, খাদিজার গর্ভে আর কোনো সন্তান নেই, একটি টিউমার আছে। সুস্থ হওয়ার পর ঢাকা নিয়ে অস্ত্রোপচার করতে বলেছিলেন হোসনে আরা। কিন্তু দুই সপ্তাহ পর খাদিজার পেটে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। হোমনার একটি ক্লিনিকে নিয়ে গেলে আলট্রাসনোগ্রাফি করে চিকিৎসক বলেন, খাদিজার পেটে টিউমার নয়; আরো একটি বাচ্চা আছে। ওই বাচ্চা মারা গেছে। এরপর ঘটনাটি জানাজানি হয়। তখন লাইফ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গোপনে খাদিজাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।