সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ০৮:৩১ পূর্বাহ্ন

মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী

বাংলার প্রতিদিন ডেস্ক ::
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৬
  • ৮১ বার পড়া হয়েছে

ঢাকা: কেউ এসেছিলেন ক্র্যাচে ভর দিয়ে, কেউ কৃত্রিম পায়ে হেঁটে। সাংবাদিক

ছেলেকে হারিয়ে এসেছিলেন মা, স্বামীকে হারিয়ে এসেছিলেন বিধবা স্ত্রী। রোগে ভুগে কর্মক্ষমতা হারিয়ে এখন অসচ্ছল হয়ে পড়া সাংবাদিকরাও এসেছিলেন। সাংবাদিকতার মতো দায়িত্বশীল মহান এই পেশায় কর্মরত কিংবা এক সময়ের সংবাদকর্মীদের এমন অবস্থায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তার হাত থেকেই তারা নিতে এসেছিলেন সহায়তা কিংবা অনুদানের চেক। মোট ১৯৬ জন দুস্থ, অসুস্থ, দুর্ঘটনায় আহত সাংবাদিক ও নিহত সাংবাদিকদের পরিবারকে ভিন্ন ভিন্ন অংকে মোট এক কোটি ৪০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হলো।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে বুধবার (২৪ আগস্ট) সকালে এই অনুদান হস্তান্তর অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন দেশবরেণ্য সাংবাদিকরা, সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব, আর সরকারের উর্ধ্বতনরা।

অনুষ্ঠানে দেওয়া প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শুরুতেই সবাইকে আপন করে নিয়ে ঘোষণা দিলেন, তিনি নিজেও গণমাধ্যম পরিবারেরই একজন সদস্য।

জানালেন তার বাবা, জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার তৎকালীন পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধি।

এর আগে সাংবাদিক নেতারা তাদের বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রধান দুটি দাবি তুলে ধরেন যার একটি নবম ওয়েজ বোর্ড ঘোষণা আর ১৯৭৪ সালে গঠিত নিউজপেপার এমপ্লয়িজ সার্ভিসেস ফাউন্ডেশন অ্যাক্ট-১৯৭৪ এর পুনর্বহাল।

তারা বলেন, পৃথক ওই আইনটি প্রণয়ন করে জাতির জনক সংবাদপত্র তথা সাংবাদিকতা পেশাকে মর্যাদার আসনে তুলে এনেছিলেন। ২০০৬ সালে সাংবাদিকতাকে শ্রম আইনের আওতায় ফেলে ওই মর্যাদা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

তারই জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নবম ওয়েজবোর্ডের কথা তিনি এরই মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে বলেছেন।

তার কাছে সাংবাদিকদের চাইতে হয় না, নিজে থেকেই দেন, এই দাবি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সাংবাদিকদের কল্যাণে ‘বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট’ স্থাপনে আমার ব্যক্তিগত আগ্রহ কাজ করেছে। আপনারা (সাংবাদিক) কেউ আমাকে কোনো পরামর্শ দেয়নি কেউ দাবিও জানাননি।

ওই ট্রাস্টের আওতায়ই এ বছর ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হলো। যার প্রাথমিক তহবিল গঠনে ৫ কোটি টাকার সিড মানি প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা তহবিল থেকেই দেওয়া হয়েছে।

অনুদান নিতে আসা প্রত্যেক সাংবাদিক কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কাউকে কাউকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেন। কারো কথা আগ্রহ ভরে শোনেন।

এর আগে দেওয়া বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। অনেক সংবাদপত্র, টেলিভিশনের মালিক রয়েছেন তাদের কাছে কোটি টাকা দান কোনও বিষয়ই নয়। তাদেরও আগ্রহী করে তুলতে হবে।

এ জন্যে প্রয়োজনে নিজেই এ ধরনের তহবিল গঠন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন, এই ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি উপস্থিত থাকলে কেউ কম টাকার চেক নিয়ে আসতে পারবেন না।

অনুষ্ঠানে ডেইলি অবজারভারের সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর হাতে ১০ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর চেয়েও বড় অংকের চেক আসতে পারে।

সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা ও কাজের ধরন নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু সে স্বাধীনতা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে উপভোগ করতে হবে।

সরকারের সমালোচনা আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, যত খুশি সমালোচনা করুন, অাপত্তি নাই। তবে সে সমালোচনা অবশ্যই গঠনমূলক হতে হবে। গণমাধ্যমের সমালোচনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমি যে কোনও ভুল সংশোধন করতে চাই।

তবে সংবাদমাধ্যমগুলোই তাদের কাজে ভুল করে, এই মত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন হলি আর্টিজানে আমরা দেখেছি হামলা হওয়ার পর কোনও কোনও টেলিভিশন চ্যানেল কিভাবে অভিযান চালানো হবে, পুলিশসহ অন্য বাহিনীর সদস্যরা কিভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে তাও জানিয়ে দিয়েছে। এতে ভেতরে জঙ্গিরাও টেলিভিশন দেখে সতর্ক হয়ে যেতে পারে।
আর তাছাড়া কে কোথায় পালিয়ে রয়েছে তাও যখন সংবাদ হয়ে যায় তখন জঙ্গিরাতো তাদের বের করে হত্যা করতেও পারে। এসব ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, খবরে মৃতদেহের বিভৎস সব ছবি দেখানো হয়। ইউরোপ, আমেরিকায় এমন হত্যাকাণ্ড এখন প্রায়শই ঘটছে, কিন্তু বিশ্বের বড় বড় সংবাদমাধ্যম বিবিসি, সিএনএন তা দেখাচ্ছে না।

এগুলোর কাছ থেকে শিক্ষা নিতে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

অনলাইনে আজকাল অনেক সংবাদমাধ্যম আসছে, উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনলাইন পত্রিকার জন্যে নীতিমালা করা জরুরি।

তিনি বলেন, অনলাইন পত্রিকা ব্যাপকভাবে বের হচ্ছে। তবে  এর কোনো নীতিমালা নেই। সবাইকে একটা নীতিমালায় আসতে হবে। ইতোমধ্যে আমরা এবিষয়ে কাজ শুরু করেছি।

শেখ হাসিনা বলেন, কেউ যাতে অশ্লীলতা ছড়াতে না পারে সে বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে। আমরা আশা করি খুব তাড়াতাড়ি অনলাইন পত্রিকার নীতিমালা করে ফেলবো।

‍তিনি বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত উন্নয়নে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই- আমাদের দেশে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা চর্চা হোক। সমালোচনা গঠনম‍ূলক হতে হবে, শিক্ষণীয় হতে হবে।

‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।’

সাংবাদিক হত্যার বিচারের দাবিও ওঠে সাংবাদিক নেতাদের পক্ষ থেকে।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিক হত্যার বিচারের জন্যে সবার সহযোগিতা দরকার। এরইমধ্যে এক সাংবাদিক হত্যার বিচার হয়েছে।  অনেকগুলো মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, আমি নিজেই আমার পরিবারের সকল সদস্যকে হারিয়েছি। তাদের হত্যার বিচার করতে আমার দীর্ঘ সময় লেগেছে। সাংবাদিকদের হত্যারও বিচার হবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবাহান চৌধুরী, তথ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি কে এম রহমত উল্লাহ, তথ্য সচিব মরতুজা আহমদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে’র সভাপতি সাধারণ সম্পাদক মনজুরুল আহসান বুলবুল ও ওমর ফারুক এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শাবান মাহমুদ ও সোহেল হায়দার চৌধুরী।

সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের আওতায় প্রথমবারের মতো ১৯৬ জন দুস্থ, অসুস্থ, দুর্ঘটনায় আহত সাংবাদিক ও নিহত সাংবাদিকদের পরিবারকে এবছর এক কোটি ৪০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হলো। বিভিন্ন বিভাগীয় ও প্রধান জেলাশহরের প্রতিনিধিরা সেখানকার অসচ্ছল সাংবাদিকদের চেক গ্রহণ করেন।

২০১২ সালে সাংবাদিক সহায়তা অনুদান ও ভাতা দেওয়ার এই নীতিমালা প্রণয়ন করে সরকার।

যারা অনুদান নিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন মৌসুমী হোসেন, হাসান মিসবাহ, আশিকুল ইসলাম, শুভ রহমান, হানিফ খানের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম, রফিকুল ইসলামের স্ত্রী নিলুফার ইয়াসমিন, সামছুল হক বসুনিয়া, ডলি রায়, মোবারক হোসেন, আহমেদ কফিলের স্ত্রী, তারেকুজ্জামান খান, মেসবাহউজ্জামানের স্ত্রী সুলতানা জামান, রীনা পারভীন, আবুল কালাম আজাদ, জয় রানী, কিশোর কুমারের স্ত্রী অঞ্জনা রানী, নজরুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন, কারনিনা খন্দকার, রুপম ভট্টাচার্য, আনোয়ার হক, মোস্তফা কামাল পাশা, মফিজুর রহমান মুফিজ, শেখ জব্বার আলম, জামাল উদ্দিন জামাল, আনিসুর রহমান, দুলাল চন্দ্র দে, সেলিম শেখ, গোলাম নবী, নজরুল ইসলাম, জামাল উদ্দিন, রশিদা বারি, কামাল উদ্দিন, সন্তোষ মন্ডলের স্ত্রী ইরা দেবী মন্ডল, দিলরুবা খান, শায়ন্তি শীলা, আলী হোসেন রিপনের মা শামসুন্নাহার প্রমুখ। এছাড়াও চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়া, খুলনাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের পক্ষে স্থানীয় সাংবাদিক নেতারা চেক গ্রহণ করেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © banglarprotidin.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themebazarbanglaro4451